আত্মতত্ত্ব দর্শনে প্রবৃত্তি ধর্মসাধন বা কর্মকান্ড

প্রবৃত্তি ধর্মসাধন বা কর্মকান্ড

প্রবৃত্তিশ্চ নিবৃত্তিশ্চ দ্বৌ ভাবৌ জীবসংস্থিতৌ

প্রবৃত্তিমার্গঃ সংসারী নিবৃত্তিঃ পরমাত্মনি ।।

যামালং

এই পৃথিবীতে জীবগণ প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তি  এই দুই ভাবে অবস্থান করে থাকে । যারা সংসারী অর্থাৎ গৃহস্থধর্মাবলম্বী তারা প্রবৃত্তি মার্গে ( পথে ) অবস্থান করে আর যারা পরমাত্মা লাভে  ইচ্ছুক অর্থাৎ বাণ প্রস্থ ধর্মাবলম্বী তারা অবস্থান করে নিবৃত্তি মার্গে ।

প্রবৃত্তি ধর্ম যাজনের জন্য যে সকল অনুষ্ঠান অবলম্বন করতে হয় তার  প্রধান প্রধান অংশগুলো সাধনাঙ্গ প্রকরণে সন্নিবেশিত হয়েছে । এখন সে গুলো কোন সময়ে কিভাবে কার্য পরিণত করতে হয় তা বলা হবে । এবং সে নিয়ম ও নীতি অনুসারে কার্য করলে প্রবৃত্তি ধর্ম সাধন করা হবে ।

পূর্বে ধর্মসাধনে প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তি মার্গ প্রস্তাবের  বর্ণনা করা হয়েছে যে, অগ্রে প্রবৃত্তি ধর্ম সাধনে সিদ্ধ হলে পরে নিবৃত্তি ধর্ম সাধনে অধিকার জন্মে এজন্য প্রথমে প্রবৃত্তি ধর্ম সাধন প্রণালী বর্ণনা করার পরে নিবৃত্তি ধর্ম সাধন প্রণালি বর্ণনা করা হবে ।

ইহ মুত্র কাম্যং চ প্রবৃত্তিমভিধীয়তে ।

ধন পুত্রাদি  ঐহিক সুখ কামনা করিয়া অথবা মৃত্যুর পর স্বর্গ সুখ কামনা করিয়া যে কর্মকান্ডের অনুষ্ঠান করা হয় তাহারই নাম প্রবৃত্তি মার্গ ।

কর্ম কান্ড (১) বললে  যে কর্তব্য অকর্তব্য সকল প্রকার কর্মকে বুঝাই বে তা  নয় । কেবল ইষ্টদায়ক অর্থাৎ মঙ্গলকর কর্মকেই বুঝাবে । যে সকল কার্য্যর দ্বারা  ইহলোকের হিত সাধন হয তারই নাম কর্মকান্ড বা প্রবৃত্তি ধর্ম । এখন দেখতে হবে যে  ইষ্টদায়ক কর্ম কি কি ?  এবং কি রুপেই বা তার নির্বাচন করা হয়েছে ,  শাস্ত্রকারগণ বলেন যে,

বেদাদি বিহিতং কর্ম লোকানামিষ্টদায়কং ।

তদ্বিরুদ্ধং ভবেত্তেষাং সর্ব্বদানিষ্টদায়কং ।।

অর্থাৎ বেদ পুরাণ তন্ত্র ইত্যাদি শাস্ত্রে নির্দিষ্ট যে সকল কর্ম তা মানব জাতির পক্ষে ইষ্টদায়ক ( মঙ্গলময় )  এবং তার বিপরীতে যে সকল কর্ম তা অনিষ্টদায়ক ।

বেদাদি বিহিত কর্ম তিন প্রকার , নিত্য , নৈমিত্তিক এবং কাম্য । যথা-

বেদাদি বিহিতং কর্ম ত্রিবিধং পরিকীর্ত্তিতং ।

নিত্য নৈমিত্তিকং কাম্যং ব্যক্ত শাস্ত্র প্রদর্শিভিঃ ।।

বেদাদি বিহিত কর্ম ত্রিবিধ , নিত্যকর্ম , নৈমিত্তিক কর্ম এবং কাম্য কর্ম । এসব শাস্ত্রজ্ঞ পন্ডিত গণ কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে ।

নিত্যকর্ম

বস্যাকরণজন্যং স্যাদ্দরিতং নিত্যমেব তৎ ।

প্রাতঃকৃত্যাদিকং তাত শ্রাদ্ধাদি পিতৃতর্পণং ।।

তত্ত্ববিচার

যে কর্মের অকরণে প্রত্যবায় জন্মে তাকে নিত্যকর্ম বলা যায় । যথা- প্রাতঃকৃত্য, প্রাতঃ সন্ধ্যা, পিতৃশ্রাদ্ধ এবং পিতৃতর্পণ ইত্যাদি ।

অর্থাৎ আমি কর্তা , আমি ভোক্তা এরুপ অহংকার রুপ বন্ধনের যে কারণ , জন্ম এবং মৃত্যুর যে কারণ , এবং নিত্য নৈমিত্তিক যাগ ব্রহ তপস্যা ও দান ইত্যাদি কার্য্যর যে ফলের অনুসন্ধান তারই নাম কর্ম ।

পঞ্চ যজ্ঞাশ্রিতং নিত্যং যদেতৎ কথিতং তব ।

নৈমিত্তিকং তথা চান্যাৎ পুত্রজন্মক্রিয়াদিকং ।

নিত্য নৈমিত্তিকং জ্ঞেয়ং পর্বশ্রাদ্ধাদি পন্ডিতৈ ।।

মার্কন্ডেয়পুরাণ ।

পঞ্চযজ্ঞাশ্রিত কর্মকে নিত্যকর্ম বলা যায় । অর্থাৎ যা প্রত্যহ করতে হবে তাই নিত্যকর্ম । নিমিত্ত জন্য যে কর্ম তাকে নৈমিত্তিক কর্ম বলা যায় ।

যেরুপপত্রজাতকর্মাদি কার্য্যর নিমিত্ত শ্রাদ্ধাদি কার্য্যর অনুষ্ঠান করতে হয় ।

নৈমিত্তিক কর্ম

মাসাদ্য বীজং যৎ  কিঞ্চিদ্বীজং নৈমিত্তিকং মতৎ

বৃদ্দিশ্রাদ্ধাদি জাতেষ্টি যাগ কর্মাদিকন্তথা ।।

স্মৃতি

যে কর্মের নিমিত্ত বিধায় মাস পক্ষাদি নির্দিষ্ট নাই কিন্তু নিমিত্তাধীন তাই নৈমিত্তিক কর্ম । যথা, বৃদ্ধিশ্রাদ্ধ, জাতেষ্টি যাগ এবং গ্রহণের জন্য শ্রাদ্ধ দানাদি ।

কাম্যকর্ম

যৎ কিঞ্চ ফলমুদ্দিশ্য যজ্ঞদান জপাদিকৃৎ ।

ক্রিয়তে কায়িকং যচ্চ তৎ কাম্যং পরিকীর্ত্তিতং ।।

গৃহস্থ ব্যক্তিকে পঞ্চসুনা জনিত পাপ হতে পরিমুক্ত হবার জন্য প্রতিদিন পঞ্চ মহা যজ্ঞের অনুষ্ঠান করতে হয় ।

পঞ্চসুনা অর্থাৎ

পঞ্চসুনা গৃহস্থস্য চুল্লী পেষণ্যুপস্করঃ ।।

কন্ডনী চোদকুম্ভশ্চ বধ্যতে যাস্তু বাহয়ন ।। 

মনু 68

গৃহস্থ ব্যক্তির চুল্লী ( উনা্ন ) , পেষণী ( শিল লোড়া ) , উপস্কর ( সূর্প চালনী ) ধুচনী ( সন্মার্জ্জনী – খাংরা, ঝাঁটা) কন্ডনী ( উদুখল, মূষল, ঢেঁকী , হামানদিস্তা ) এবং উদকুম্ভ  ( জল কলস ) ইত্যাদিকে পঞ্চসুনা বলে ।

এই পঞ্চ সুনা অর্থাৎ গার্হস্থ সামগ্রী কার্য নিয়োজিত হলে তাদ্বারা যে সকল জীব হিংসার শিকার হয় , সেই হিংসার জন্য পাপ হতে মুক্তি লাভের জন্য গৃহস্থ ব্যক্তিকে প্রতিদিন পঞ্চ মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করতে হয়  ।