মন্দির নির্মান বন্ধ করে দিল পাকিস্তানের ইসলাম পন্থিরা


প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের নেতৃত্বে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান সহিষ্ণুতার নিদর্শন হিসাবে সরকার এই মন্দিরটির নির্মান করতে চেয়েছিল আর যার জন্য অনেক প্রশংসা পেয়েছেন । তবে আলেমদের চাপ বাড়ল, এবং সরকার তাতে পদক্ষেপ নিল।

পাকিস্তানের ইসলামাবাদের বুকে এটি হত হিন্দুদের জন্য প্রথম মন্দির । অসাম্প্রদায়িকতার নিদর্শন হিসেবে মন্দিরটি সহনশীলতার প্রতীক বলে মনে করা হয়েছিল। তার পরিবর্তে, এখন এই মন্দির সহিংসতা এবং বিতর্কের জন্ম দিয়েছে । আর এখন এই মন্দিরকে ইস্যু করে সংখ্যালঘুদের সাথে পাকিস্তানের সংখ্যাগুরুদের মাঝে ঝামেলার সম্পর্কের প্রতীক হিসাবে পরিণত রুপায়িত হয়েছে ।

২০১৮ সালে যখন পাকিস্তানের প্রাক্তন সরকার শ্রী কৃষ্ণ মন্দির বা কৃষ্ণ মন্দিরের জন্য জমি বরাদ্দ দিয়েছিল, তখন মুসলিম বিক্ষোভকারীরা পাকিস্তানের রাজধানীতে কোনও হিন্দু কাঠামো নির্মাণের অনুমতি কে প্রত্যাখ্যান করে দ্রুত মন্দিরের জন্য বরাদ্দকৃত জায়গায় শিবির স্থাপন করে। তবে আইনি প্রক্রিয়ায় মন্দিরের হিন্দু উকিলরা বিজয়ী হয়েছিল এবং গত মাসে যখন মন্দিরের প্রথম ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল, তখন সরকারী কর্মকর্তারা ঘোষণা করেছিলেন যে এটি পাকিস্তানের পক্ষে একটি নতুন, সহনশীল অধ্যায়ের সূচনা করবে। এর কয়েক দিন পরে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান মন্দিরটি নির্মাণের জন্য প্রায় ১.৩ মিলিয়ন ডলার সরবরাহের নির্দেশ দিয়েছেন, যা প্রয়োজনের প্রায় এক পঞ্চমাংশ।

হিন্দু সংসদ সদস্য এবং শাসক দলের সদস্য লাল চাঁদ মাহলি বলেছিলেন, “আমরা যখন ভিত্তি দিয়েছিলাম, প্রধানমন্ত্রী আমাদের একটি বৈঠকে বলেছিলেন যে তিনি মন্দিরটি বাইরের বিশ্বের কাছে পাকিস্তানের তরফ থেকে একটি ভাল বার্তা দেবেন বলে তিনি যথেষ্ট খুশি,” পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ।
এরপরে আবার মুসলিম আলেমরা আবার প্রবেশ করল এবং পরিস্থিতি বদলাতে লাগল।

একাধিক আলেম রায় দিয়েছিলেন যে , কোনও হিন্দু মন্দির তৈরি করা উচিত নয় ইসলামাবাদে । কারণ পাকিস্তান একটি মুসলিম দেশ। পাকিস্তানের ইসলামিক সংগঠনগুলো মন্দিরের জন্য অর্থ সরবরাহ করার জন্য সরকারকে নিন্দা করে। এবং মিডিয়া আউটলেটগুলি প্রকল্পটি বন্ধ করার জন্য প্রকাশ্যে প্রচারণা চালিয়েছে।

এরপরে সরকার মন্দিরের খালি জমির চারপাশে নির্মিত একটি প্রাচীরের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়ে রায় দেয় যে কমপ্লেক্সটির নকশা প্রথমে পার্লামেন্টে অনুমোদন করতে হবে। ইসলামাবাদের হিন্দু কাউন্সিল দাবি করেছে যে মন্দিরের জন্য প্রাচীর টি প্রয়োজনীয়তা ছিল এবং তারা আশঙ্কা করেছিল যে মুসলিম উগ্রপন্থীরা জমিটি দখল করার চেষ্টা করবে এবং মন্দিরের নির্মাণের আগের মতোই বিলম্ব করবে। তারা যুক্তি দিয়েছিল যে অনুরূপ বাধা পুরো পাকিস্তানের মুসলিমরা করবে । তাদের অনুমান ঠিকই হল , ইসলামাবাদে মন্দির নির্মান এখন একেবারেই অনিশ্চিত ।

অবশেষে রবিবার মন্দিরের আশেপাশে ইসলামিক সংগঠনের লোক একত্রিত হতে থাকে এবং তাদের মধ্যে থেকে একদল লোক মন্দিরের জমির চারপাশে আংশিকভাবে নির্মিত প্রাচীরটি ধ্বংস করে দেয়, তারা আরো দাবি করে যে এটি করা তাদের ইসলামিক কর্তব্য। তারা আনন্দের সাথে ধর্মীয় অনুপ্রেরণায় মন্দিরের প্রাচার ভেঙ্গে দিয়েছে । আর এটি সোশ্যাল মিডিয়ায়তে ও প্রচার করা হয়েছে , আর এটা অন্যায় নয় বলে পাকিস্তানের মুসলিমরা সমর্থন করছে । এ ঘটনায় কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।

দুই সপ্তাহের মধ্যে, ইসলামাবাদের প্রথম হিন্দু মন্দিরকে কেন্দ্র করে হিন্দুরা যে আশার আলো দেখেছিল হতাশার মেঘে আবৃত হয়ে যায় । যদিও মিঃ খানের সরকার ধর্মীয় সহাবস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল । তার সরকার ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে । সে প্রতিশ্রুতির আর শেষ রক্ষা হল না ।

২০১৭ সালে প্রাক্তন সরকারের অধীনে মন্দিরটির পরিকল্পনার অনুমোদনের সময়, মিঃ খান এই পরিকল্পনাটি কার্যকর করেছিলেন এবং অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন যে পাকিস্তানের সহিংস সাম্প্রদায়িক অতীতকে মুছে দিয়ে পাকিস্তানের অসাম্প্রদায়িকতা ও সার্বজনীনতার অধ্যায়ের সূচনা হবে ।

মিঃ খানের নির্বাচনী প্রচার চলাকালীন, তিনি পাকিস্তানের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য অবস্থার উন্নতি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, প্রায়শই দ্বিতীয়-শ্রেণীর নাগরিক হিসাবে বিবেচিত হন এবং হিংস্র ইসলামপন্থীদের আক্রমণকে লক্ষ্য করে খুব কম সংঘাতের শিকার হন। তিনি তাদের উপাসনা স্থান পুনরুদ্ধার করার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন।

মিঃ খান গত বছরের শেষের দিকে যখন ৫০০ বছরের পুরানো গুরুদ্বার দরবার সাহেব করতারপুরে শিখ ধর্মের পবিত্রতম মন্দির পুনরায় চালু করেছিলেন তখন তার প্রতিশ্রুতিটি কার্যকর হয়েছে বলে মনে হয়েছিল। পাকিস্তানের প্রতিবেশী এবং আধ্যাত্মিক ভারতে তাদের মুসলিম সংখ্যালঘুকে প্রান্তিককরণের সময় সরকার তাদের ধর্মীয় সহনশীলতার প্রমাণ হিসাবে পুনরায় উদ্বোধনের প্রশংসা করেছিল।

মঙ্গলবার অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল হিন্দু মন্দিরের বিরুদ্ধে এই অভিযানের নিন্দা করেছে এবং হিন্দু কাউন্সিলকে অবিলম্বে ভবন পুনরায় নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান ওমর ওয়ারাইচ বলেছেন, “প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান যে প্রতিশ্রতি দিয়েছেলেন তা রক্ষা করা উচিত নয়ত তার প্রতিশ্রুতি আর প্রতিজ্ঞার কোন মূল্য থাকবে না । হিন্দুদের ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি তাঁর যে প্রতিশ্রুতি তা অবশ্যই পালন করা উচিত , ইসলামিক সংগঠনের কাছে মাথা নত করা উচিত নয় । পাকিস্তানে বসবাসরত হিন্দু এবং অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নির্দ্বিধায় এবং নির্ভয়ে তাদের বিশ্বাস অনুশীলন করতে সক্ষম হয় তার ও নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে,”
মিঃওয়ারাইচ আরো বলেছেন-
“সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অপরাধীদের রিপোর্টগুলি তাত্ক্ষণিকভাবে তদন্ত করে দায়ীদের অবশ্যই প্রশাসনের হস্তক্ষেপে আদালতের কাঠগড়ায় নিয়ে এসে তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।” সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে এই ধরনের অবিচারের যথাযথ বিচার করা গেলে এ জাতীয় ঘটনা পুনরাবৃত্তি হবে না এবং অন্যায় ও প্রতিরোধ সম্ভব হবে।

যদিও হিন্দুরা পাকিস্তানের জনসংখ্যার দুই থেকে চার শতাংশের মধ্যে, তবে তাদের উপাসনা করার জন্য ইসলামাবাদের কোনও মন্দির নেই । এরকম পরিস্থিতিতে যদি তাদের আত্মীয়রা মারা যায়, সনাতন ধর্মানুসারি সংস্কৃতির নিয়ত নীতে পালন করে শেষকৃত্য করার জন্য শব নিয়ে দীর্ঘ দূরত্বে হিন্দু-পরিচালিত শ্মশানে যেতে হয় । তাই ইসলামাবাদে হিন্দুদের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে মন্দির নির্মান খুবই প্রয়োজন ।

পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের একটি রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত । পাকিস্তানের জনকত মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তান কে একটি ধর্মনিরপেক্ষ এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে সংবিধান রচনা করেছিল । যা এখনও দেশজুড়ে সম্মানিত। কিন্তু ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভক্তির ফলে কয়েক দশক পরেও হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে যে সহিংসতার ভাব তা আরো বেড়ে গেছে । আর এমন কি এখন পাকিস্তানে বসবাসরত হিন্দুদের কোন বাক স্বাধিনতা ও নেই ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *