প্রশিক্ষণ – প্রশিক্ষণের গুরুত্ব এবং বৈশিষ্ট্যসমূহ

প্রশিক্ষণ

কার্যকরী মানব সম্পদ সৃষ্টির অন্যতম উপায় হলো প্রশিক্ষণ । কেননা কর্মীর সফলতার উপর প্রাতিষ্ঠানিক সফলতা নির্ভরশীল ।
নিম্নে প্রশিক্ষণ সম্পর্কে আলোচনা করা হলোঃ
সাধারণত প্রশিক্ষণ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো অনভিজ্ঞ বা স্বল্প অভিজ্ঞ কর্মীকে হাতে কলমে শিক্ষা প্রদান ।
অন্যভাবে বলা যায়, কাজে কর্মীদের উৎসাহ বৃদ্ধি পেশাগত, জ্ঞান ও দ্ক্ষতা এবং মনোভাব ও আচরণের পরিবর্তনের জন্য যে, শিক্ষাদানের কৌশল গ্রহণ করা হয় তাকে প্রশিক্ষণ বলে ।
প্রামাণ্য সংঙ্গাঃ নিম্নে কতিপয় লেখকের সংঙ্গা প্রদান করা হলোঃ
M.J. Jucius- এর মতে, প্রশিক্ষণ হলো যেকোনো প্রক্রিয়া যা কর্মীদের নির্দিষ্ট কার্য সম্পাদনের প্রবণতা দক্ষতা ও সামর্থ্য বৃদ্ধি করে ।
Skinner ও Ivancevich- এর মতে, কর্মীদের উচ্চমাত্রার কার্যসম্পাদনে সহায়তাদানের অবিরত প্রক্রিয়া হচ্ছে প্রশিক্ষণ ।
Prof. R.W. Griffin বলেন, প্রশিক্ষন সাধারণত কার্যগত ও প্রযুক্তিগত কর্মীদের কীভাবে কাজ করতে হবে তা শিক্ষা দেয় যার জন্য তাদেরকে নিয়োগে করা হয়েছিল ।
Robert Keritner- এর মতে, কতিপয় নিদিষ্ট অভিজ্ঞতার মাধ্যমে কর্মীর আচরণ এবং মনোভাবের পরিবর্তন সাধনের প্রক্রিয়াকে প্রশিক্ষন বলে ।

প্রশিক্ষণের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
প্রশিক্ষণ হলো যেকোনো প্রক্রিয়া যা কর্মদের নিদির্ষ্ট কার্য সম্পাদনের প্রবণতা দক্ষতা ও সামর্থ্য বৃদ্ধি করে । গুণগত মান উন্নয়ন করে প্রতিষ্ঠানের অধিক মুনাফা অর্জনের পথ সুগম করে ।
নিম্নে প্রশিক্ষণের গুরুত্ব আলোচনা করা হলো-
১. উৎপাদন বৃদ্ধিঃ উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে । প্রশিক্ষণ একজন কর্মীকে তার কাজে অভিজ্ঞ করে তোলে । যার ফলে সময় বাঁচে এবং সে অধিক উৎপাদনে ব্রতী হয় ।
২. কর্মসন্তুষ্টি বৃদ্ধিঃ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মীর দক্ষতা, ইতিবাচক মনোভাব ও কাজের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের মনোবল ও উন্নত হয় । যার ফলে কর্মীর কার্যসন্তুষ্টি বৃদ্ধি পায় ।
৩. কর্মীর মনোভাব পরিবর্তনঃ কর্মীর মনোভাব পরিবর্তনে প্রশিক্ষণের প্রভাব অনেক । Kreitner বলেন, প্রশিক্ষণ কতিপয় নির্দেশিত ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে কর্মী আচরণ ও মনোভাবে পরিবর্তন করে । ফলে কর্মীর ইতিবাচক মনোভাব বৃদ্ধি পায় ।
৪. সময় জ্ঞানঃ প্রশিক্ষনের মাধ্যমে সময় সম্পর্কে সচেতন করা হয় । কর্মীরা যদি যথা সময়ে তাদের কার্যাবলি সম্পাদন করতে না পারে তাহলে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয় ।
৫. দক্ষতা বৃদ্ধিঃ যেকোনো পেশায় সাফল্য অর্জনের জন্য দক্ষতা প্রয়োজন । আর এ দক্ষতা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নতুন ও পুরাতন সকল কর্মীর আচরণগত পরিবর্তন , নিদির্ষ্ট দক্ষতা অর্জন, জ্ঞান ও মনোভাব উন্নয়ন ও পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য প্রশিক্ষণ প্রয়োজন ।
৬. সহজ তত্ত্বাবধানঃ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের অধিক নির্দেশনা ও তদারকের প্রয়োজন হয় না । ফলে নির্বাহীরা অল্পসময়ে অধিক সংখ্যক অধস্তনের কাজ তদারক করতে পারে ।
৭. সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনাঃ সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কাজে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীরা নানাভাবে পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করে থাকে ।
৮. উন্নত শিল্প সম্পর্কঃ প্রশিক্ষণের ফলে কর্মীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণের ইতিবাচক পরিবর্তন হয় । ফলে ব্যবস্থাপনার সাথে কর্মীরা সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় । এ ধরনের সহযোগীতামূলক ভূমিকা উন্নত শিল্প সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্র তৈরি করে ।

প্রশিক্ষনের বৈশিষ্ট্যঃ
কর্মীদের উচ্চমাত্রার কার্যসম্পাদনে সহায়তা দানের অবিরত প্রক্রিয়া হচ্ছে প্রশিক্ষণ । একটি প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠ কার্যপরিবেশ বজায় রাখাও দক্ষ ব্যবস্থাপনার জন্য প্রশিক্ষণ অপরিহার্য । প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কর্মদক্ষতা গড়ে তূলতে সাহায্য করে ।
১. প্রশিক্ষনের আওতাঃ প্রশিক্ষণকার্যক্রম কেবলমাত্র নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানের নিদির্ষ্ট কর্মীবৃন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে । তবে ক্ষেত্রবিশেষ প্র্রতিষ্ঠানের সমুদয় কর্মীকেও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা যায় । তাই বলা যায় , প্রশিক্ষনের আওতা সুনিদির্ষ্ট ।
২. প্রশিক্ষণ পূর্ব নির্ধারিতঃ প্রশিক্ষণ পূর্ব নির্ধারিত বিষয় অনুযারি কার্যকর হয় । প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের শুরুতেই নির্ধারণ করা হয় । যে কত জন কর্মীকে কত সময়ের মধ্যে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয় ।
৩. সংগঠিত প্রক্রিয়াঃ প্রশিক্ষণ হচ্ছে শিক্ষাদানের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া । প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মীদের কারিগরি আচরণগত এবং কার্য সম্পাদনের দক্ষতা ও উৎকর্ষতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালানো হয় ।
৪. প্রশিক্ষনের উদ্দেশ্যঃ প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য হবে সুনিদিষ্ট কী উদ্দেশ্য প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে তা পূর্ব থেকেই নির্ধারিত করা হয়ে থাকে । তাই নিদির্ষ্ট কার্য সম্পাদনের লক্ষ্যে কর্মীদের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির কৌশলই হলো প্রশিক্ষণ ।
৫. ধারাবাহিক কর্মপন্থাঃ প্রশিক্ষণ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া । একজন কর্মীকে তার কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পরিবর্তনের জন্য পুনঃপুণঃ প্রচেষ্টা চালাতে পদ্ধতি গ্রহণ করা হয় ।
৬. নমনীয়তাঃ পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যবিধান করার ব্যবস্থা প্রশিক্ষনে থাকতে হয় । নমনীয়তা প্রশিক্ষনের একটি বড় গুণ । নমনীয়তা ছাড়া প্রশিক্ষণ কার্যক্রম লক্ষ অর্ঝনে সহায়ক হতে পারে না ।
৭. আধুনিক ও বস্তুনিষ্ঠঃ সাধারণত প্রশিক্ষণ কার্যত্রম আধুনিক প্রস্তুতির উপর ভিত্তি করে প্রণয়ন করা হয় । কারণ এর ফলে প্রশিক্ষণ বস্তুনিষ্ট হয় ও কর্মীদের প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয় ।

প্রশিক্ষণ একটি স্পর্শকাতর বিষয় । এর সাথে কর্মীর আচরণ, মনোভাব ও কার্ষের প্রতি ও ক্রিয়াশীলতার সম্পর্ক রয়েছে । প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে কল্যানমুখি ও বাস্তব প্রয়োগযোগ্য করার জন্য উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যগুলোর সমাহার ঘটানো প্রয়োজন ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *