অমৃতত্ত্ব বলতে কি বুঝায়

সৃষ্টিতে কেউ অমর নয় । জন্ম হলেই মৃত্যু অবশ্যম্ভাবি । আমাদের এ শরীর নিয়ে চিরকাল যে বর্তমান থাকব , তা কোনদিনই পারব না ।আর ধরেই নিলাম যে আমরা চিরকাল বর্তমান থাকব , তাকে তো অমরত্ব বলা যাবে না ।আর চিরকাল বেঁচে থাকাও সম্ভব ও নয় ।

মৃত্যুর পর আমাদের আত্মা সুক্ষ্মু শরীর গ্রহণ করবে কিন্তু তবু আমরা অমর হব । কারন মৃত্যুর পর সকলেই সে অবস্থাতেই থাকে । আবার কর্মফল শেষে জন্মান্তর বাদ অনুযারি পুনরায় সৃ্ষ্টিতে জন্মচক্রের অধিনে আসতে হবে । আর যতদিন এ জন্মমৃত্যুর চক্র হতে জীব নিজেকে মুক্ত করতে পারবে না ততদিন কেউ অমরত্ব লাভ করতে পারবে । জন্ম মৃত্যুর চক্র থেকে নিষ্কৃতি লাভই হল অমৃতত্ব ।

আমরা সবাই মোহ এবং মায়াতে জড়িত । আমরা সব সময় বলি এটা আমার , ওটা তোমায় , । আমাদের  এই আমি অর্থাৎ অহং ভাবটাই আমাদের মুক্ত হতে বাধা দিচ্ছে ।  যে দেহের কোন দাম নেই , সেই দেহ নিয়ে সব সময় আমরা আমি ‘ আমি করি কিন্তু এদেহের ভিতর যে মূল তত্ত্ব আছে  তার কোন খোঁজ খবর নেই না । দেহের ভিতর মূল তত্ত্ব হল দেহি অর্থাৎ আত্মা ।

আমরা অজ্ঞান বশতঃ এই দেহটাকেই আমি বোধ করি আর এটাকেই দেহাত্ববোধ বলে । কিন্তু ভুলে গেছি আত্মা আর দেহ  এক নয় । আমরা মোহে আচ্ছন্ন হয়ে দেহকে মনে রেখেছি আর আত্মাকে রেখেছি দুরে । যখন আমাদের জ্ঞান উদয় হয়ে , আত্ম অনুভবে বলবৈ, আত্মা দেহ হতে পৃথক ,  এই জ্ঞানকেই বলা হয় দেহাত্ববিবেক জ্ঞান ।যতদিন এই জ্ঞান লাভ হবে না ততদিন অমৃতত্ব কি বুঝা যাবে না ।

দেহা অনিত্য , আত্মা নিত্য । দেহ আর আত্মার মধ্যে এই পৃথক জ্ঞান জেনে আত্মার কর্ম করে পরমাত্মার সাথে লীন হতেই পারলেই অমৃতত্ব লাভ হয় ।

যখন আত্মজ্ঞান উদয় হয । দেহ আর আত্মা এক নয় । তখন আত্মকর্মে নিয়োজিত করে যে আনন্দ অনুভব হয় তাই আত্মার আনন্দ । তাই বলা হয়ে , আত্মা আনন্দস্বরুপ ।

যে বস্তু ক্ষনিক সময়ের জন্য , যার কোন অস্তিত্ব নাই , সে সব বস্তুতে যখন আমরা আসক্ত হয়ে পড়ি তখন আমরা দুঃখ অনুভব করি, কষ্ট পাই , শোকে বিমোহিত হই । কারণ অজ্ঞান দ্বারা আত্মার আনন্দ আচ্ছন্ন থাকে ।  এই অজ্ঞানতাই হল মৃত্যু ।

শুধু যে মরলেই মৃত্যু হবে তা নয় । জীবিতি অবস্থায় মানুষ যদি আত্মার কর্ম না করে , অহং দ্বারা পরিচালিত হয় , অজ্ঞান দ্বারা আত্মার কর্মকে ঢেকে রাখে তাই তো মৃত্যু । এই অজ্ঞান যখন কেটে যাবে তখন আত্মা তার নিজস্ব মহিমায় ফিরে আসবে , আর চারদিক হবে আনন্দময় । তাই- অমৃতত্ব-আত্মানন্দ, নিত্যানন্দ, ব্রহ্মানন্দ, প্রেমানন্দ ।

আমরা যারা অজ্ঞানী বুঝি না আত্মতত্ত্ব ।তারাই মনে করে সনাতন অনুসারিরা বহুঈশ্বরবাদী ।কিন্তু না । আগে ত্রিবিধ বিষয়ে কিছু বলা যাক ।

ব্রহ্ম , আত্মা, ভগবান একই তত্ত্ব । এরাই ত্রিবিধ , ত্রিতত্ত্ব নামে অভিহিত । সাধক , উপসাকদের বৈশিষ্ট্যর কারণে ত্রিবিধভাবে প্রকাশিত হয়েছেন ।

সাধক যখন এ দেহচৈতন্যর উর্ধে উঠে ব্রহ্মচৈতন্য অথবা   আত্মচৈতন্য অথবা ভাবগত – চৈতন্য অবস্থান করেন , তখন তিনি অমৃতত্ব লাভ  করেন ।

সুখে যার আনন্দ নাই ,দুঃখে যারা কষ্ট নাই , আপনজন বিয়োগে যার শোক নাই – অর্থাৎ সব সময় সমভাব তিনিই অমৃতত্ব লাভ করেন ।

এখন এ কথায় প্রশ্ন আসতে পারে –

বিষয়ের স্পর্শে সুখ দুঃখ এরকম আরো অনেক দ্বন্ধ আসবে । সংসারে থাকলে অথবা বিষয়ের মধ্য থাকলে তা বাদ দেওয়া যায় না । অনেক শাস্ত্র তো বলে সংসার ত্যাগ করতে, বিষয়-ত্যাগ করতে , কর্ম ত্যাগ করতে । তাহলে এমতাবস্থায় কর্তব্য কি ?

সনাতন ধর্মীয় শাস্ত্র শ্রীমদ্ভগবদগীতা  বলে,

ত্যাগ অর্থ  আসক্তি ত্যাগ , কামনা বাসনা ত্যাগ , মোহ মায়া ত্যাগ , লোভ , লালসা, হিংসা বিদ্বেষ ত্যাগ । অহং অর্থাৎকাচা  আমিত্ব ভাবটাই ত্যাগ ।যদি আসক্তি থাকে তাহলে সময় ভাল গের সুভ অনুভব হবে আর খারাপ সময়  এলে কষ্ট দুঃখ অনুভব হবে আর   এ সবের কারণে চিত্ত চাঞ্চল্য হবে স্থির হবে না ।

অজ্ঞানীরা মনে করে সংসারে থেকে আসক্তি ত্যাগ করা যায় না কিন্তু জ্ঞানীরা মনে করে – সংসারে থেকে আসক্তি ত্যাগ করেও সংসার করা যায় । বিষয় – কামনা না করিয়াও বিষয় ভোগ করা যায় । ফল – কামনা না করিয়া ও কর্ম করা যায় ।  শ্রীমদ্ভগবদগীতা এরকমেই উপদেশ দেন । আর এটাই কর্তব্য । কামনা অর্থের মূল , একে শাস্ত্রের হৃদয় গ্রন্থি বরে । এ হৃদয়  গ্রন্থি ছিন্ন করতে পারলে মর মানুষ অমর হতে পারে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *